
৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিবেশের সূচনা হয়েছিল, তা অনেকের কাছেই ছিল নতুন এক সম্ভাবনার প্রতীক। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা ও বিভাজনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, এবার হয়তো এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না; ক্ষমতার লড়াই থাকবে, কিন্তু আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন থাকবে।
জুলাই আন্দোলনে রাজপথে নামা হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ কোনো রাজনৈতিক দলের পদ-পদবি বা ব্যক্তিগত সুবিধার আশায় আন্দোলন করেননি। তারা একটি নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, শুধু সরকার বদলাবে না, রাজনৈতিক সংস্কৃতিও বদলাবে।
কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, বাস্তবতা যেন সেই স্বপ্নের সঙ্গে ততই সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে।
রাজনীতির মাঠে আজও নানা অভিযোগ ও বিতর্ক ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিএনপির কিছু তৃণমূল নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। যদি এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু একটি দলের ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং পরিবর্তনের প্রতি মানুষের বিশ্বাসও নষ্ট করবে।
অন্যদিকে, জামায়াত ও শিবিরের কিছু সমর্থকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে অনলাইন হয়রানি, ট্রলিং ও কুরুচিপূর্ণ প্রচারণার অভিযোগ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। গণতন্ত্রে মতের জবাব মত দিয়ে, যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়াই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়। ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অনলাইন বিদ্বেষ কখনো সুস্থ রাজনীতির বিকল্প হতে পারে না।
একইভাবে এনসিপিকে ঘিরেও বিভিন্ন সময়ে মব সংস্কৃতি, উত্তেজনাপূর্ণ কর্মসূচি এবং কিছু স্থানে চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া কিংবা প্রতিবাদ অবশ্যই গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু যদি কোনো কর্মসূচি আইনের শাসনের বাইরে চলে যায়, তাহলে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও জনগণকেই বহন করতে হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রাজনৈতিক ভাষার দ্রুত অবনতি। দুই বছরও পূর্ণ হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে যুক্তির চেয়ে গালি, তথ্যের চেয়ে অপপ্রচার এবং বিতর্কের চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ বেশি দেখা যায়। এটি শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয়, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।
মনে রাখতে হবে, জুলাই আন্দোলন কোনো একক দল, ব্যক্তি বা সংগঠনের সম্পত্তি নয়। এটি ছিল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি ঐতিহাসিক গণআন্দোলন। তাই এর কৃতিত্ব নিয়ে বিভাজন সৃষ্টি নয়, বরং এর মূল্যবোধকে রক্ষা করাই হওয়া উচিত সবার দায়িত্ব।
আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনার। বিএনপিকে তৃণমূলে অনিয়ম ও চাঁদাবাজির অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। জামায়াতকে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের রাজনীতি কখনো অনলাইন বিদ্বেষ, সাইবার হয়রানি বা কুরুচিপূর্ণ প্রচারণাকে প্রশ্রয় দেবে না। এনসিপিকেও স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে যে তারা মব নয়, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশ্বাস করে।
রাজনীতি যদি জনগণের আস্থা হারায়, তাহলে কোনো দলেরই প্রকৃত বিজয় হয় না। কারণ ক্ষমতা পরিবর্তন করা সহজ, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করা কঠিন।
বাংলাদেশের মানুষ সংঘাত নয়, স্থিতিশীলতা চায়। প্রতিহিংসা নয়, পারস্পরিক সম্মান চায়। চাঁদাবাজি নয়, জবাবদিহিতা চায়। অনলাইন বিদ্বেষ নয়, যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক বিতর্ক চায়। আর মব সংস্কৃতি নয়, আইনের শাসন চায়।
দেশ বড়, দল নয়। গণতন্ত্র বড়, ক্ষমতা নয়। যদি এই সত্যটি সব রাজনৈতিক শক্তি উপলব্ধি করতে পারে, তাহলে ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিবর্তনের যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, তা এখনও বাস্তবে রূপ নেওয়া সম্ভব। অন্যথায় ইতিহাস হয়তো আবারও লিখবে, সুযোগ ছিল
কিন্তু আমরা সেই সুযোগকে নিজেদের হাতেই নষ্ট করেছি।
মোঃ মিরাজুল ইসলাম