
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একটি চমৎকার তথ্যবহুল প্রবন্ধ লিখলেন এ্যাডভোকেট নাজিম উদ্দিন আহমেদ পান্না, প্রাক্তন সম্পাদক বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতি,আহবায়ক জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম বরিশাল ইউনিট,পাবলিক প্রসিকিউটর বরিশাল মহানগর দায়রা জজ আদালত , আইন উপদেষ্টা বরিশাল সিটি কর্পোরেশন,সদস্য বরিশাল জেলা বি.এন.পি (দক্ষিন)।
আমাদের ইতিহাসের যুগোসন্ধিক্ষনের এক ব্যতিক্রমী চরিত্র শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের অমিততেজা বীর যোদ্ধা ও রাষ্ট্রনায়ক শুধু এদেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কই নয়,আধিপত্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের উদ্বোধকও বটে। ৩০ মে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফলে ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান শহীদ হন।এই হত্যাকান্ডের ফলে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পরাজিত শক্তি লাভবান হয়।
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারী বগুড়া জেলার বাগবাড়ী গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জিয়াউর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমানের পিতা মনসুর রহমান ছিলেন পেশায় কেমিষ্ট এবং রত্নগর্ভা মাতা জাহানারা খাতুন ছিলেন একজন বিদুষী মহিলা ও পাকিস্তান রেডিও এর নজরুল সঙ্গীত শিল্পী। জিয়াউর রহমানের শিশুকাল অতিবাহিত হয় বগুড়া জেলার বাগবাড়ী গ্রামের বাড়িতে। স্কুল জীবনের প্রথমভাগে তাহার পিতার কর্মস্থল কলিকাতার হেয়ার স্কুলে তিনি পড়াশুনা করেন। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের ফলে মনসুর রহমান চাকুরীর সুবাদে করাচী চলে যান। করাচী একাডেমী স্কুল থেকে ১৯৫২ সালে জিয়াউর রহমান কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জি.ডি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে জিয়াউর রহমান কমিশন্ড অফিসার হিসাবে পাক সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেন এবং ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেনেন্ট হিসাবে কমিশন পদ লাভ করেন। ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমান দিনাজপুরের ইসকান্দার আলীর কন্যা খালেদা খানমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সেই খালেদা খানমই আজকের দেশনেত্রী সদ্য প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া।
শহীদ জিয়াউর রহমানের মধ্যে অনেকগুলো গুনের সমাবেশ ঘটেছিল, যা সচারাচর দেখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, বহুদলীয় গনতন্ত্রের পূণঃ প্রতিষ্ঠাতা, আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি,
ইসলামী উম্মাহর ঐক্য প্রচেষ্টার অগ্রদূত, সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা, তৃতীয় বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা ও বলিষ্ট কন্ঠস্বর এবং সফল রাষ্ট্রনায়ক। শহীদ জিয়া সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ লেখনী এই স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। শুধুমাত্র শিরোনামমূলক লেখনী তুলে ধরছি।
শহীদ জিয়ার কর্মক্ষেত্র শুরু হয় ১৯৫৫ সালে পাক সামরিক বাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেনেন্ট পদ লাভের মাধ্যমে। ১৯৫৭ সালে তিনি ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলী হন। তদানিন্তন পাক-ভারত সামরিক প্রতিযোগীতামূলক পরিবেশে উভয় দেশ সামরিক গোয়েন্দা বিভাগে অপেক্ষাকৃত চৌকষ অফিসারদের নিয়োগ করতেন। জিয়াউর রহমান ১৯৫৯ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাক সামরিক গোয়েন্দা বিভাগে কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বেজে উঠে যুদ্ধের দামামা। ভারতের তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ২৪ ঘন্টার মধ্যে লাহোরে গিয়ে চা পান করার অভিলাশ ব্যক্ত করেন। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে থাকা বাঙ্গালী অফিসার ও জোয়ানদের সাহসী লড়াইয়ে তুনখন্ডের মত উড়ে যায় ভারতের স্বপ্নস্বাধ। প্রায় সকল সেক্টরে ভারতীয় বাহিনী লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যায়। সেই ভয়াবহ সমরে জিয়াউর রহমান ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানী নিয়ে যুদ্ধ করেন খেমকারান সেক্টরে। ১৯৬৬ সালে জিয়াউর রহমান কাকুলস্থ পাকিস্তান সামরিক একাডেমীর প্রশিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯৬৯ সালে জিয়াউর রহমান জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সালে চট্টগ্রামে নবগঠিত অষ্টম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি করা হয় জিয়াউর রহমানকে।
১৯৭০ সালের পাকিস্তান গনপরিষদে নির্বাচনে আওয়ামীলীগ নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।পাক সেনা আমলাতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসাবে শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা শুরু করে। সামরিক আমলাতন্ত্রের সাথে ষড়যন্ত্রে মিতালী গড়ে তুলে জেড, এ ভুট্টো। ক্ষমতার লড়াইয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ হয় অনিবার্য। সেই ঐতিহাসিক মুহুর্তে শেখ মুজিব নিজেকে সমর্পন করেন পাক বাহিনীর হাতে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দলে দলে ছুটে গিয়ে হুমড়ী খেয়ে পড়লেন ভারত মাতার কোলে। জনগনকে হিংস্র হায়নার মুখে রেখে সেদিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটু নিরাপদ আশ্রয় লাভের জন্য সমগ্র বিশ্ব নিখিল ভারতের কাছে হস্তান্তরে ছিল উন্মুখ। জাতির সেই সংকটময় মুহুর্তে জাতিকে দিক নির্দেশনা দিতে এগিয়ে আসেন মেজর জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামস্থ কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র
থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন মেজর জিয়া। সেই ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের আলোকে বর্তিকা রূপে কাজ করে। মুক্তিযুদ্ধ কালে তিনটি সেক্টর সমন্বয়ে গঠিত জেড-ফোর্সের অধিনায়ক হিসাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চীফ অফ ষ্টাফ নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালে কর্ণেল পদে এবং ১৯৭৩ সালের মধ্য ভাগে ব্রিগেডিয়ার ও শেষভাগে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
অপপ্রচারকারীগণ জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একই গোষ্ঠী অপপ্রচার করেন জিয়া সামরিক শাসন জারী করেন। আধিপত্যবাদের পদোলেহীগন ইনিয়ে বিনিয়ে বলেন কর্ণেল তাহের জিয়াকে রক্ষা করেছে, আর জিয়া তাহেরকে ফাসিতে ঝুলায়। আসুন তথ্য প্রমানের ভিত্তিতে দেখি বিষয়গুলো কতটুকু সত্য। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক এটা চন্দ্র, সূর্য্যের ন্যায় সত্য। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে ১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমান ভারত সফরকালে এক ভোজ সভায় ভারতের রাষ্ট্রপতি এন. সঞ্জিব রেডিড বলেন, Your position is already assured in the annals of the history of your country as a brave fighter who was the first to declare the independence of Bangladesh (Ref: অধ্যাপক সামসুল হকের Bangladesh in International Politics, Page-96। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বব্যাপী ঝটিকা সফর করেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থণ আদায়ের লক্ষ্যে। ৬ নভেম্বর নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষনদান কালে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, “The cry for independence arose after Sheik Mujib was arrested and not before. He himself so far as I know has not asked for independence even now” (Ref: Bangladesh documents, Information ministry, Govt. of India Vol-11, Page-275। অর্থাৎ স্বাধীনতার ডাক এসেছিল শেখ মুজিব গ্রেফতার হবার পরে, তার পূর্বে নয়। শেখ মুজিব সরকারের খাদ্য প্রতিমন্ত্রী এবং প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম বলেন, “তাজ উদ্দিন আহমেদ সহ ঢাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় পদ্মাতীরের আগারগাঁও গ্রামে অবস্থানকালে মেজর জিয়ার ঘোষণা শুনেছিলাম। মেজর জিয়ার আহবান বেসামরিক-সামরিক তথা বাংলার সর্ব শ্রেণীর মানুষকে সংগ্রামে উজ্জীবিত করে”। (সুত্রঃ- স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্র, ১৫ খন্ড, পৃষ্ঠা-৯৫)।
দ্বিতীয়তঃ অপপ্রচারকারীগণ জিয়াকে সামরিক শাসন জারীর জন্য অভিযুক্ত করেন।বাস্তবে জিয়াউর রহমান সামরিক শাসন জারী করেন নি। তিনি সামরিক শাসন পেয়েছিলেন উত্তারাধিকার সূত্রে এবং পরবর্তীকালে শহীদ জিয়া দেশ ও জাতিকে সামরিক শাসন থেকে মুক্ত করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার সহ সকরুন মৃত্যু ঘটে। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন প্রবীন আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তিনি দেশে সামরিক শাসন জারী করেন। মোশতাক মন্ত্রী সভার সকলেই কোন না কোন সময় মুজিব মন্ত্রী সভার সদস্য ছিলেন। ২৫ আগষ্ট জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর চীফ অফ ষ্টাফ নিযুক্ত হন। ৩ নভেম্বর বাকশাল পন্থী একটি সামরিক গ্রুপ রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে মোশতাক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং জিয়াকে গৃহবন্দী করেন। প্রেসিডেন্ট হন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহী জনতার বিপ্লবে জিয়াউর রহমান পুনরায় সেনাবাহিনীর চীফ অফ স্টাফ নিয়োজিত হন এবং পূর্ব ঘোষিত সামরিক আইনে পদাধিকার বলে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
তৃতীয়ত: অপপ্রচারকারীগন বলেন, কর্ণেল তাহের জিয়াকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করেন এবং জিয়া তাহেরকে ফাসিতে ঝুলায়। এই অপপ্রচার ইতিহাস স্বীকার করেনা। ১৫ আগষ্টের নায়ক ছিলেন কর্ণেল (অবঃ) ফারুক-রশিদ গং। ৩ নভেম্বর পাল্টা কু করেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ। ৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগ ঢাকার রাজপথে মিছিল করে। মিছিলে নেতৃত্ব দেন খালেদ মোশারফের মাতা এবং ছোট ভাই কৃষকলীগ নেতা রাশেদ মোশারফ। এই মিছিলের ফলে খালেদ মোশারফ ভারতের এজেন্ট হিসাবে চিহ্নিত হন। সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ৪ ও ৫ নভেম্বর সারাদেশ থেকে সেনা সদস্যগন ঢাকা অভিমূখী হয়। খালেদ মোশারফের চাপে ৫ নভেম্বর দিবাগত রাতে ফারুক-রশীদ গং ঢাকা ত্যাগ করেন। ফারুক-রশীদের ঢাকা ত্যাগের ফলে খন্দকার মোশতাক হন ঢাল তলোয়ার বিহীন নিধিরাম সর্দার। খালেদ মোশারফের চাপে ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় খন্দকার মোশতাক পদত্যাগ করেন। এই পরিস্থিতিতে ঘোলাজলে মাছ শিকার করতে এগিয়ে আসেন কর্ণেল আবু তাহের এবং তার সৈনিক সংস্থা। কর্ণেল আবু তাহের বন্দী জিয়ার ইমেজকে ব্যবহার করে নিজ ক্ষমতা সংহত করার চেষ্টা করেন। অপর দিকে ফারুক-রশীদ গং ঢাকা ত্যাগ করায় তাহাদের সহযোগী বেঙ্গল ল্যান্সার ও ২ ফিল্ড আর্টিলারী বাহিনী হয় নেতৃত্বশূণ্য। এই নেতৃত্ব শূণ্য সৈনিকগন নিজেদের প্রয়োজনে গৃহ।
বন্দীদশা থেকে জিয়াকে মুক্ত করেন। বেঙ্গল ল্যান্সার ও ২ ফিল্ড আর্টিলারী বাহিনী গোলাগুলি শুরু করলে জিয়াকে বন্দী রাখার দায়িত্ব পালনকারী সৈন্যগন পালিয়ে যায়। জিয়াউর রহমান বন্দী দশা থেকে মুক্ত হন। ক্ষমতার লড়াইয়ে তাহের জিয়াকে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ প্রসঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির ত্বাক্তিক নেতা হায়দার আকবর খান রনো বলেন, “৭ নভেম্বর বিপ্লব শুরুর পূর্বে সৈনিক সংস্থার সভায় জিয়াকে বিপ্লবী সংস্থার হেড কোয়ার্টারে এনে বন্দী করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। জিয়াকে যদি সত্য সত্যই সেনানিবাসের বাইরে আনতে পারতো, তবে তার ভাগ্যে কি ঘটতো, জাসদ নেতাগনই জানেন।” এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ সাংবাদিক এ্যান্থনী তার বই “এ লিগ্যাসি অব ব্লাড”-এ লিখেছেন, “৭ নভেম্বর ভোর ৫.৩০মিঃ। ইতিমধ্যে অনেক সিনিয়র আর্মি অফিসার জিয়ার সাথে দেখা করে বিদায় নিয়েছেন। এরই মাঝে চলে আসেন কর্ণেল আবু তাহের। জিয়া তাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং অন্যদের মতো তার সাথে কোলাকুলি করেন। কিছু কথাবার্তার পর তাহের তাকে রেডিও ষ্টেশনে নিয়ে যেতে চাইলে অন্য অফিসারগন নিরাপত্তার কারনে যেতে বারণ করেন। এতে কর্ণেল তাহের রেগে আগুন হয়ে ওঠেন। জিয়াকে রেডিও ষ্টেশনে না পাঠিয়ে তারা একটি রেকর্ডিং ইউনিটকে জিয়ার বাসায় নিয়ে আসেন।
তখন জাসদ তথা সৈনিক সংস্থা সিপাহী দ্বারা অফিসার হত্যায় মেতে উঠেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় আবু তাহের জিয়াকে মুক্ত করেননি। অপর দিকে কর্ণেল তাহেরকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়নি। ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণকে সকলেই তখন সমর্থন করেছিল। মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হওয়ায় তার বার্তার মাধ্যমে তাকে দোয়া করেছিলেন। তার বার্তায় বলেছিলেন- “May Allah Bless you and your government. Let Army and the people be united to work for independence and sovereignty. Let there be rule of Rububiat for the emancipation of mankind irrespective of creed and caste.”
শহীদ জিয়াউর রহমান বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ও দূরদর্শী ছিলেন। মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে তিনি ১৯৭৭ সালে “২১ পদক” প্রদান প্রথা প্রবর্তন করেন। দূরদর্শী জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন আজকের শিশুই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক। সেই উপলব্ধি থেকে তিনি ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন শিশু একাডেমী। ১৯৭৭
সালের ১৫ জুলাই শিশু একাডেমী ঢাকায় স্থায়ী ভাবে কাজ শুরু করে। কৃষক বন্ধু জিয়াউর রহমান আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ফলে কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটে। ১৯৭৪-৭৫ সালে সারা দেশে ধান উৎপন্ন হয় ১ কোটি ১১ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন। ১৯৮০-৮১ সালে সমগ্র দেশে ধান উৎপন্ন হয় ১ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন। জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন একটি নিরক্ষর জাতির পক্ষে উন্নয়ন অসম্ভব। তাই ১৯৮০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী জিয়াউর রহমান জাতীয়ভাবে নিরক্ষরতা দূরীকরন কর্মসূচী চালু করেন। ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান সরকার আইন করে মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ মাসের শিক্ষকদের বকেয়া বেতন প্রদান করেন। স্বাধীনতার পর দেশের শাসকগোষ্ঠী সীমাহীন দূর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। শহীদ জিয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান ও ন্যায় ভিত্তিক সমাজ গঠণে চেষ্টা করেন এবং সফল হন। ১৯৭৪-৭৫ সালে দেশে মোট বৈদেশিক খাদ্য সাহায্য এসেছিল ৫১ কোটি মার্কিন ডলারের উপরে। তখন জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬০ লাখ। গানিতিক হিসাবে মাথা পিছু বৈদেশিক সাহায্য ছিল প্রায় ৬.৭ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে ১৯৮১ সালে দেশে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৯ কোটি। ৯ কোটি লোকের জন্য খাদ্য সাহায্য এসেছিল ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের সমমূল্যের। গানিতিক হিসাবে মাথা পিছু ২.৮ মার্কিন ডলার। দুর্ণীতি কারনে ৭৪ সালে লাখ লাখ আদম সন্তান দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারায়। দূর্ণীতি মুক্ত হওয়ায় ১৯৮১ সালে দেশে কোন খাদ্য সংকট ছিল না। এদেশের কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে শহীদ জিয়া “খাল কাটা” কর্মসূচী উদ্বোধন করেন। তার শাসনামলে ১৪০০ খাল খনন হয়। ফলে কৃষিতে বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধিত হয়। মুজিব সরকারের তুলনায় শহীদ জিয়ার সরকার আমলে জি.ডি.পি ৩.৩৩ গুন বৃদ্ধি পেয়েছিল। জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে জিয়াউর রহমান সময় উপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পল্লীর জনগন যেন বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুমুখে পতিত না হয় তার ব্যবস্থা করেন শহীদ জিয়া। তিনি পল্লী চিকিৎসক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ফলে মাত্র ১ বছরে পল্লী চিকিৎসক প্রশিক্ষন প্রাপ্ত হন ২৭০০০ পল্লী চিকিৎসক।
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব একদলীয় শাসন ব্যবস্থা “বাকশাল” গঠণ করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের দাফন কার্য সম্পন্ন করেন। বাকশাল ছিল একটি “মনহরনী ডাইনী”। ১৯৭৬ সালে গণতন্ত্রের মানসপুত্র জিয়া ‘রাজনৈতিক দল বিধি ১৯৭৬’ জারী করেন। ফলে দেশে বহু রাজনৈতিক দলের পুনরুজ্জীবন ঘটে। ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে বহু দলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান। মুজিব সরকার ভ্রান্তনীতি “বাঙালী
জাতীয়তাবাদ” প্রবর্তন করেছিলেন। ফলে সংগত কারনেই আদিবাসীগণ সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। পাহাড়ী জনপদ গুলো বহু আদিবাসী ও বাঙ্গালীর রক্তে রঞ্জিত হয়। আমাদের দেশে যেমন বাংলা ভাষা ভাষীর লোক রয়েছে, তেমন অন্যান্য ভাষার লোক আছে। অপর দিকে বাংলা ভাষা ভাষীর লোক আমাদের দেশের বাহিরে অনেক আছে। তাই বাঙালী জাতীয়তাবাদ সমগ্র দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করতে অক্ষম। জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বাঙালী, চাকমা, গাড়ো, সাওতাল, মুরং, খাসিয়া, কুকী সহ সকল জাতি সত্তাকে ঐক্যবদ্ধ করে। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান মিলে মিশে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ।
শহীদ জিয়া দীন ইসলামের সাচ্চা খাদেম ছিলেন। ১৯৭৮ সালে দ্বি-বার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় ৪টি বিভাগীয় শহরে জিয়া সরকার ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করে, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকান্ডকে বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেন। ধর্ম মন্ত্রনালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা শহীদ জিয়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘ধর্ম বিভাগ’ নামে একটি পৃথক বিভাগ গঠণ করেছিলেন জিয়া সরকার। যাহা পরবর্তীকালে পূর্ণাঙ্গ ধর্ম মন্ত্রণালয়ে রূপান্তরিত হয়। জিয়াউর রহমান সংবিধানে “বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম” সংযোজন করেন।
যুব সমাজকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়ার লক্ষ্যে জিয়া সরকার গঠন করেন যুব কমপ্লেক্স। জাতীয়তাবাদী যুবদল গঠণের মাধ্যমে তিনি যুব সমাজকে সচেতন ও সংগঠিত করেন।
স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের তেমন কোন প্রাপ্তি বা অবদান ছিলনা। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে ইসলামী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে জিয়াউর রহমান সফর করেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, পাকিস্তান, মালি, সেনেগাল, সিরিয়া, তুরস্ক প্রভৃতি দেশ। মুসলিম দেশগুলোর স্বার্থরক্ষায় জিয়াউর রহমান বলিষ্ঠ ও স্বাধীনচেতা ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের ফলে তেহরানস্থ মার্কিন দূতাবাসে প্রায় ৪৫০ জন মার্কিন নাগরিক জিম্মি হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কার্টার চাপ প্রয়োগ করেও ইরানের বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমানের সমর্থন আদায় করতে পারেননি। তখন বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ছিল। ইরান- ইরাকের মধ্যে ভ্রাত্রিঘাতী যুদ্ধ বন্ধে জিয়াউর রহমান বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ১৯৮১ সালে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) এর অন্যতম সহ সভাপতি পদ লাভ করে বাংলাদেশ। শহীদ জিয়ার সুযোগ্য নেতৃত্বের কারনে সে সময় বাংলাদেশ ১৫ সদস্য বিশিষ্ট জেরুযালেম সমন্বয় কমিটি, ৬ সদস্য বিশিষ্ট জাতিসংঘের
জেরুযালেম সমন্বয় কমিটি, ৩ সদস্য বিশিষ্ট আল কুদস কমিটি ও ৩ সদস্য বিশিষ্ট ইরান-ইরাক কমিটির সদস্য মনোনীত হয়। জিয়াউর রহমান শিল্প সংস্কৃতিক উন্নয়নে সচেষ্ট ছিলেন। ১৯৮১ সালে ঢাকায় এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর উদ্ধোধন করেন জিয়াউর রহমান। ঢাকা চারুকলা ইনষ্টিটিউট ছাত্রদের ছাত্রাবাস এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ আজও শহীদ জিয়ার অবদানের সাক্ষ্য দেয়। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণের প্রয়োজনে তিনি সার্ক গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। দক্ষিণ এশীয় ৭টি দেশ নিয়ে গঠিত সার্ক আজ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে। সার্কের স্বপ্ন দ্রষ্টা ছিলেন জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরপত্তা পরিষদের সদস্য পদ লাভ করে। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য বাংলাদেশের আপত্তির কারনেই ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘ ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেনি। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান মক্কায় তায়েফে ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৭৭ সালের ৮ জুন তিনি লন্ডনে কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগদান করেন।
নারী সমাজের কল্যাণ সাধনে জিয়াউর রহমানের অবদান অপরিসীম। নারী সমাজের কল্যান সাধনে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল ও মহিলা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সময়ের বিবর্তনে উহা মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে রূপ লাভ করে। নারী সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে সাবালম্বী করতে জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় মহিলা সংস্থা। স্বাধীন বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম মহিলা রাষ্ট্রদূত ও মহিলা অডিটর জেনারেল নিয়োগ করেছিলেন। তিনি মহিলা পুলিশ, আনসার ও ভি.ডি.পি গঠন করেন। কর্মজীবি মহিলাদের বাসস্থান সমস্যার সমাধানে কর্মজীবি মহিলা হোষ্টেল প্রতিষ্ঠা করেন। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ১৫ থেকে ৩০ এ উন্নীত করেন। চাকুরীর ক্ষেত্রে নন-গেজেটেড পদে ১৫% এবং গেজেটেড পদে ১০% কোটা নির্ধারন করেন। শহীদ জিয়ার মন্ত্রী সভায় মহিলা মন্ত্রীর সংখ্যা ছিল ৬%। জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে যৌতুক বিরোধী আইন প্রনয়ন করেন।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বি.এন.পি) গঠণ করেন। বাংলাদেশের চলমান অগ্রগতিকে থামিয়ে দিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফলে জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সনের ৩০ মে কতিপয় বিপথগামী সৈন্যের হাতে শহীদ হন আজকের মৃত্যু বার্ষিকিতে বিজয়ী জাতির-বিজয়ী নেতার স্মৃতির প্রতি জানাই স্বশ্রদ্ধ সালাম নিজের মুখ থেকে নিজের অজান্তে বেড়িয়ে যায়, মরনে হাসিছো তুমি কাঁদিছে ভূবন।